Wednesday, October 14, 2009

বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি নজরুল

শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন খেলাধুলা ও ব্যায়ামের প্রয়োজন, তেমনি মনের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন বিনোদন। আর বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে গান। তবে সে গান যদি হয় আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামী বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে তাহলে তো কথাই নেই। এতে যেমন চিত্ত বিনোদনও হয়, তেমনি ইসলামের প্রতি আগ্রহও সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষায় যেসব গীতিকার ইসলামী গান লিখেছেন, তাদের মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম সবার আগে চলে আসে। ইসলামের এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা পর্ব নেই যা নিয়ে তিনি গান কিংবা কবিতা লিখেননি। তো ইসলামী গান রচনায় নজরুলের অবদান সম্পর্কে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছি।
অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি মসজিদে মুয়াযযিন ছিলেন এবং ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন। যে ইসলামী ভাবধারা নিয়ে তিনি জীবনযাত্রা শুরু করেছিলেন, তিনি তা আজীবন লালন করে গেছেন। আল্লাহ প্রেম ও রাসূলের প্রতি ভালবাসা ঠাঁই পেয়েছিল তার মনের গহীনে। তাইতো তিনি তার কবিতা ও গানের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ-রাসূলের বাণী শুনিয়েছেন এবং কোরআন হাদিসের আলোকে মানবতার গান গেয়েছেন।
আল্লাহর পরিচয় কি, তিনি কাছে না দূরে থাকেন, তাঁকে চেনার উপায় কি এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে নজরুল বলেছেন, আল্লাহ যদিও ধরাছোঁয়ার বাইরে, তবুকে এই মহান সত্তাকে চেনা যাবে তার সৃষ্টিতে, তাঁকে অনুভব করা যাবে প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে। তিনি এক স্থানে বা এক বস্তুতে সীমাবদ্ধ নন, বরং আকাশ-জমিনের সর্বত্র তিনি বিরাজমান। সে জন্যই কবি আল্লাহর নির্দিষ্ট কোন নাম খুঁজে পাননি। আল্লাহর ৯৯টি গুনবাচক নাম থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে 'অ-নামিকা' নামে সম্বোধন করেছেন। কবি লিখেছেন-
কোন নামে হায় ডাকব তোমায়নাম না জানা অ-নামিকাজলে স্থলে গগন তলেতোমার মধুর নাম যে লিখা।।নজরুল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ্যত্বের পাশাপাশি তার সৌন্দর্যও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর সৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন,
হে চির-সুন্দর, বিশ্ব চরাচরতোমার মনোহর রূপের ছায়া,রবি শশী তারকায় তোমারই জ্যোতি ভায়রূপে রূপে তব অরূপ কায়া।
তিনি কেবল আল্লাহর সৌন্দর্যই বর্ণনা করেননি, তাঁর উপর ভরসা রাখাও আহবান জানিয়েছেন। লিখেছেন-
ও মন, কারো ভরসা করিসনে তুইএক আল্লাহর ভরসা কর,আল্লাহ যদি সহায় থাকেনভাবনা কিসেব, কিসের ডর।
নজরুল আল্লাহকে খুঁজেছেন সৃষ্টির সব সৌন্দর্যের মাঝে। সৃষ্টির যেখানেই রূপ দেখেছেন, সেখানেই আল্লাহকে স্মরণ করে তাঁরই বন্দনা করেছেন। এক গানে কবি ফুলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, হে ফুল ! বলো তো তুমি এ সুগন্ধ কোথায় পেলে ? এই অতুলনীয় রূপ তোমায় কে দিল, যার কারণে তুমি দুনিয়ায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছো। ফুল উত্তরে বলেছিল, আল্লাহ তায়ালাই আমাকে এই রূপ আর সুগন্ধি দান করেছেন। নজরুলের ভাষাতেই শোনা যাক -
ফুলে পুছিনু, বলো বলো ওরে পুল, কোতা পেলি এ সুরভী, রূপ এ অতুল ? -
আগেই বলেছি যে, নজরুলের কবিতা ও গানে আল্লাহ প্রেমের কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তার কয়েকটি গানের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ আমার প্রভূ আমার নাহি নাহি ভয়, খোদার প্রেমের শারাব পিয়ে বেহুশ হয়ে রই পড়ে, ‘মাগো আমায় শিখাইলী কেন আল্লাহ্‌ নাম, জপিলে আর হুঁশ থাকে না ভুল সকল কাম'; ‘যে পেয়েছে আল্লাহর নাম সোনার কাঠি, তার কাছে ভাই এই দুনিয়া দুধের বাটি'; ‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে, ফলবে ফসল বেচব তারে কিয়ামতের হাটে।' এসব গান ছাড়াও কবি নজরুল তাঁর গানের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে অনেক কিছু চেয়েছেন। এ ধরনের কয়েকটি গান হলো, ‘তওফিক দাও খোদা ইসলামে, মুসলিম জাঁহা পুন হোক আবাদ' ; ‘রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করো না বিচার, বিচার চাহি না তোমার দয়া চাহে এ গুনাহগার'; ‘খোদা এই গরীবের শোন শোন মুনাজাত', "আল্লাহর কাছে কখনো চেয়ো না ক্ষুদ্র জিনিস কিছু, আল্লাহ ছাড়া কারো কাছেও কভু শির করিও না নিচু" ইত্যাদি ।
কবি নজরুল আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেম নিবেদনের পাশাপাশি রাসূলের প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছেন। কখনো তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে নবীজীর রওযা জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, আবার কখনও নবীজী জন্ম, তাঁর জীবন দর্শন, তাঁর শিক্ষা ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, নবীজীকে নিয়ে তিনি নাত লিখেছেন একশ'র উপরে ! মহানবী প্রশংসা ও গৌরবসূচক এসব গানের জন্য মুসলিম সমাজ কবি নজরুলের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। নজরুল কয়েকটি নাতে রাসূলের কলি হচ্ছে, "ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়, আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।""মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলাতুমি বাদশার বাদশাহ, কামলিওয়ালা।"" মোহাম্মদ না জপেছিলি বুলবুলি তুই আগেতাই কি রে তোর কণ্ঠের গান এমন মধুর লাগে।""মোহাম্মদ মোর নয়ন-মনি মোহাম্মদ মোর জপমালাঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসরের পিয়ালা।"
কবি নজরুল যে মানুষটিকে নয়নমনি ভেবেছেন তাঁকে নিয়ে যে সুন্দর সুন্দর গান লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। সে যাই হোক, নজরুলের লেখা আরো কয়েকটি বিখ্যাত নাতে রাসুল এরকম-নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহমদ বোল, তৌহিদেররই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম, তোমার নামে একি নেশা হে প্রিয় হযরত, এ কোন মধুর শারাব দিলে আল-আরাবী সাকি, মোহাম্মদ নাম যতই জপি ততই মধুর লাগে, রসুল নামের ফুল এনেছি রে গাথবি মালা কে ?, ইয়া মোহাম্মদ বেহেশত হতে খোদায় পাওয়ার পথ দেখাও- ইত্যাদি।
কেবল হামদ ও নাত লিখেই নজরুল ক্ষান্ত হননি, তিনি মুসলিম জাতির পরিচয়, তাদের অতীত, মুসলমানদের বিভিন্ন পর্ব ইত্যাদি নিয়ে চমৎকার সব গান লিখেছেন। মুসলমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-
ধর্মের পথে শহীন যাহারা আমরা সেই সে জাতিসাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি।
অন্যদিকে ঈদ, কোরবানী, মহররম, ফাতিহা-ই-দোয়ায-দহম তথা রবিউল আউয়াল নিয়ে প্রচুর ইসলামী গান ও কবিতা লিখেছেন। ঈদ নিয়ে নজরুলের লেখা 'ও মন রমজানের ঐ রোযার শেষে এল খুশীর ঈদ-এ গানটি না শুনলে ঈদের আনন্দই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। অন্যদিকে মহররমের চাঁদ এল ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়া, ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়- এ মর্সিয়াটির মাধ্যমে আমরা কারবালায় শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করি।
মহররমের শোকের পাশাপাশি নবীজীর আবির্ভাবের আনন্দঘন দিনটি অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,আসিয়াছেন হাবিবে খোদা, আরশ পাকে তাই ওঠেছে শোর;চাঁদ পিয়াসে ছুটে আসে আকাশ পানে যেমন চকোর।অথবাইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগরবদনসীন আয়, আয় গুনাহগার নতুন করে সওদা কর। অথবাত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।
১২ রবিউল আউয়াল, মহরররম ছাড়াও কবি নজরুল নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি বিষয়েও গান ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখা থেকে বাদ পড়েননি ইসলামের বিশিষ্ট সাহাবী ও ইসলামী আন্দোলনের যোদ্ধারাও। নজরুলের কাব্য ও গানে ইসলামের বিভিন্ন দিক চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে বলেই তিনি আজও মুসলিম সমাজে এত জনপ্রিয়। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে নজরুলই একমাত্র সফল লেখক যিনি তার কলমের মাধ্যমে মুসলিম জাহানের সোনালী অতীত ফিরে পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘তওফিক দাও খোদা ইসলামে, মুসলিম জাঁহা পুন হোক আবাদ' ।
কবি নজরুলের ইসলামী গানের বিশাল ভান্ডার থেকে কয়েকটি গান নিয়ে আলোচনা করা হলো। আপনারা সুযোগ পেলে তাঁর লেখা ইসলামী গানগুলো শোনার চেষ্টা করবেন -কেমন !

No comments:

Post a Comment