Wednesday, October 14, 2009

ইমাম হাসান (আ)

ইসলামের ইতিহাসে পণেরোই রমযান একটি ঐতিহাসিক দিন, আনন্দের দিন । কারণ তৃতীয় হিজরীর এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমাতুয যাহরা ( সা ) এর বড় সন্তান ইমাম হাসান ( আ )।
বিশ্বব্যাপী রমযান আসে রহমত,মাগফেরাত আর নাজাতের শুভবার্তা নিয়ে। আর হযরত আলী ( আ ) গৃহে এই রমযান এসেছে আরো একটি খুশির আমেজ নিয়ে। এই খুশি কোরআনের বসন্তে নবজাতকের সুরেলা কান্নার খুশি। এই খুশি হযরত ফাতেমা ( সা ) এর মাধ্যমে নবীবংশের বিস্তারের খুশি। এই খুশি বিশ্বমানবতার জন্যে সঠিক পথে পরিচালিত হবার দিক-নির্দেশকের শুভজন্মের খুশি। রমযান তাই আমাদের জন্যে এই সুসংবাদটি নিয়ে হাজির হয় প্রতি বছর। পণেরোই রমযানকে তাই আমরা বিশেষভাবে উদযাপন করবো। ইমাম হাসান ( আ ) এর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে সেগুলোকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবো। রমযানের মহাবরকতময় দিনগুলোর ঠিক মাঝখানে আমরা ইমামের জীবনের একটি বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করতে পারি। বৈশিষ্ট্যটি হলো তিনি ছিলেন অসম্ভব দানশীল। তাঁর দানশীলতার বৈশিষ্ট্যটি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে আমরাও ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারি।
ইমাম হাসান ( আ ) অসহায়-বঞ্চিতদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। জনগণের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য এবং পুণ্যের পথে তিনি সকল সুযোগ-সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর দানের বিষয়টি ইতিহাস খ্যাত। ইতিহাসে এসেছে- ইমাম হাসান (আ) তাঁর জীবনে দুইবার নিজের সকল সহায়-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার নিজের অর্থ-সম্পদের অর্ধেকটা গরীব-অসহায়দের দান করেছেন। রমযান মাসে আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ গরীব-অসহায়দের প্রতি যদি সদয় দৃষ্টি দেই তাহলে রমযানের কল্যাণে আমাদের দানের মর্যাদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে।
ইমাম হাসান ( আ ) এর জীবনের আরেকটি বিশেষ গুণ আমরা চর্চা করতে পারি,তাহলো গর্ব-অহংকারহীনতা। রমযান মাসে এই শিক্ষাটি আমাদের সবার জন্যেই মঙ্গলজনক। একদিন ইমাম হাসান ( আ ) তাঁর চলার পথে কিছু ফকীরকে দেখতে পেলেন দরিদ্রসুলভ দস্তরখান পেতে রুটির টুকরো চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছে। তারা ইমামকে দেখে বললোঃ হে রাসূলের সন্তান! আসুন ! আমাদের সাথে আহার করুন! ইমাম দ্বিধাহীন চিত্তে পরিপূর্ণ আগ্রহ ও উৎসাহের সাথে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এবং দ্রুত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে তাদের সাথে বসে পড়লেন। বসেই তিনি বললেন-আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না-এই বলে তিনি ফকিরদের সাথে আহার করতে শুরু করলেন। না,কেবল খেলেনই না, বরং তাদেরকে নিজের বাসায় দাওয়াতও করলেন। অতিথি ফকিরগণ যখন ইমামের বাসায় এলেন, ইমাম হাসান তাদেরকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করলেন এবং তাদের মেহমানদারি করলেন। সেইসাথে তাদের সবাইকে নতুন জামা-কাপড়ও উপহার দিলেন।
এই যে ছোট্ট ঘটনাটি,এতে আমাদের জন্যে বেশ কয়েকটি শিক্ষা রয়েছে। প্রথম শিক্ষাটি হলো মানুষকে মানুষ হিসেবেই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থ-সম্পদের দিক থেকে শ্রেণীবিন্যস্ত করে কাউকে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। আমাদের সমাজের দিকে তাকালে এর দৈন্যতার ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা যাবে। এ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি। ফলে আল্লাহর সৃষ্টিকে সমানভাবে ভালোবাসতে হবে। গরীবদেরকে গরীব হবার কারণে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ঠিক নয়। কী অদ্ভুত কাণ্ড! আমরা কি কখনো একজন ফকিরকে বাড়িতে দাওয়াত করে খাইয়েছি ! অথচ একজন গরীবকে দাওয়াত করে খাওয়ালে সেই গরীব লোকটি নিজের মর্যাদা উপলব্ধি করে আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। উপরন্তু তাকে যদি কিছু উপহার দান করেন তাহলে তো কথাই নেই। মনের গভীর থেকে সে আপনার জন্যে দোয়া করবে। রমযান মাসে ইমামের সম্মানে এই অনুশীলনটি করা যেতে পারে।
এখানে আরো যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির শিক্ষা রয়েছে,তাহলো নিরহঙ্কারী হওয়া। গর্ব-অহংকারবিহীন জীবন গড়ে তোলা আমাদের জন্যে খুবই জরুরি। আসলে আমাদের গর্ব করার মতো আছেটাই বা কী! এই পৃথিবীর কোনো কিছুইতো আমার নিজের নয়। যতো ধন-সম্পদ,জ্ঞান-গরিমা সবই তো আল্লাহ দয়া করে আমাদের দান করেছেন। ফলে সবই তো আল্লাহর। এই চিন্তাটি যদি আমাদের মাথায় কাজ করে তাহলে নিজের যতো বিত্ত-বৈভবই থাকুক না কেন,তা যে আমার নয়,সে ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস বেড়ে যাবে অর্থাৎ ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তখন দেখা যাবে আমার সাথে আর ঐ ফকির লোকটির সাথে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তাই বড়াই করার মতো কোনো কিছু আর অবশিষ্ট থাকবে না। সেরকমই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন ইমাম হাসান ( আ )।
সর্বোপরি মানুষকে ভালোবাসতে হবে অন্তর থেকে। তথাকথিত রাজনীতিকদের মতো নয়,যারা ভালোবাসার আনুষ্ঠানিকতা দেখায়। গরিবদের প্রতি বাহ্যিকভাবে ব্যাপক আনুকূল্য দেখায় ভোটের জন্যে, আর ভোটে জেতার পর সেই গরীব লোকদের হক বা অধিকার ভূলুণ্ঠিত করে। তাদের জন্যে বরাদ্ধকৃত বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী,অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি খেয়ে দোযখের মতো বিশাল উদর পূর্তি করে। বরং ভালোবাসতে হবে ইমাম হাসান ( আ ) এর মতো। শ্রেণীভেদে সবার সাথে মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যেতে হবে। তাদের ভালোবাসতে হবে নিজের ভাইয়ের মতো করে। তাহলে আল্লাহও আপনাকে ভালোবাসবেন। রমযানের পবিত্রতম দিনগুলোতে আমরা ইমাম হাসান ( আ ) এর প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাঁরি জীবনের এই অকৃত্রিম আদর্শগুলো চর্চা করার চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ।
রাসূলে খোদা ( সা ) আল্লাহর ইচ্ছায় নবজাতকের নাম রাখলেন হাসান। হাসান ইবনে আলী ( আ ) নবীজীর স্নেহ-আদরের ছায়ায় সাতটি বছর কাটাবার সুযোগ লাভ করেছেন। শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলোতে রাসূলে খোদার দুর্লভ সান্নিধ্য ও সাহচর্য ছিল হাসান (আ) এর জীবনের অমূল্য অর্জন। নানাজির মতো বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বের নূরে তাঁর হৃদয়মন নুরান্বিত হয়েছিল,সমৃদ্ধ হয়েছিল-যা মানবিক পরিপূর্ণতার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম দুর্লভ সৌভাগ্য নবীজীর সন্তানদের ললাটেই বেশিরভাগ জুটেছে,যা একদিকে যেমন প্রশান্তি ও সমৃদ্ধির অপরদিকে মহা আনন্দের বিষয়।
ইতিহাসে এসেছে ইমাম হাসান মুজতবা ( আ ) দেখতে রাসূলে খোদা ( সা ) এর মতো ছিলেন। চেহারায় রাসূলের সাথে খুব বেশি মিল ছিল তাঁর। নবীজীও ভীষণরকম আদর করতেন তাঁকে। ইমাম হাসান ( আ ) ও নানাকে খুব বেশি পছন্দ করতেন। নবীজী তো নিয়মিত মদিনার মসজিদে যেতেন,বক্তব্য রাখতেন। ইমাম হাসানও প্রতিদিন যেতেন মসজিদে নানার সুমিষ্ট ও মূল্যবান বাণী শোনার জন্যে। ইমাম যখন ছোট্ট,তখনই নানার মুখের ওহীসমৃদ্ধ কথাগুলো বুঝতে পারতেন এবং বাসায় ফিরে নবীজীর মূল্যবান শিক্ষাগুলোকে মায়ের কাছে বর্ণনা করতেন।
ইমাম হাসান ( আ ) কিন্তু ছোট্টবেলা থেকেই সুন্দর করে কথা বলতেন। ইমামের সমকালীন এক ব্যক্তি,তাঁর নাম ছিল উমায়েদ ইবনে ইসহাক,তিনি ইমাম হাসান ( আ ) এর কথা বলার সৌন্দর্য সম্পর্কে বলেছেনঃ হাসান ইবনে আলী ( আ ) যখন কথা বলতেন,তখন অনুরোধ করতাম যেন বক্তব্য অব্যাহত রাখেন। আমি তাঁর কথা শুনে ভীষণ উৎফুল্ল হতাম,তৃপ্ত হতাম। তাঁর পবিত্র মুখে রূঢ় কোনো শব্দ উচ্চারিত হতে কখনোই শুনি নি। সেই ছোট্ট বেলাতেই ইমাম হাসান ধর্মীয় বিষয়-আশয়ে বেশ জ্ঞান রাখতেন। নবীজী এবং হযরত আলী ( আ ) হাসান ( আ ) এর এই জ্ঞান সম্পর্কে জানতেন। সেজন্যে তাঁরা ধর্মীয় নিয়ম-নীতি সম্পর্কে জনগণ প্রশ্ন করলে তার জবাবের জন্যে মাঝেমাঝে হাসান ( আ ) এর কাছে পাঠাতেন। আর ইমাম হাসানও অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং যোগ্যতার সাথে জনগণের প্রশ্নের যথার্থ জবাব দিতেন।
হাসান ইবনে আলী ( আ ) এর স্বভাব-প্রকৃতিতেই একটা অভিজাত ও মহানুভব ভাব ছিল সুস্পষ্ট। যে-ই তাঁকে দেখতো মানসিক প্রশান্তি ও তৃপ্তিবোধ করতো,এককথায় তাঁকে ভালো লাগতো সবার। জালালুদ্দিন সুয়ূতি তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন-হাসান ইবনে আলী ( আ ) এর চারিত্রিক মাধুর্য এবং মানবিক গুণাবলী ছিল প্রচুর। তিনি ছিলেন মহৎ, নম্র ও সহিষ্ণু চরিত্রের অধিকারী এবং মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও ঔদার্যের অধিকারী। জনগণের কাছে তিনি ছিলেন ভীষণ প্রশংসনীয়।
হে ইমাম ! বিষের পেয়ালায় চুমু দিয়ে আমাদের করেছো ঋণীআমরা তোমার পদাঙ্ক দেখে দেখে এগিয়ে চলেছিসামনের দিকে , কিন্তু কোথায় তুমি , মরুঝড় এসে বুঝি মুছে দিলো তোমার পদচিহ্নএবার কীকরে পাবো সত্যের নাগাল !রাতের আঁধারে দূর আকাশে জ্বলজ্বলে একটি তারাপথ দেখালো শেষে , যার আলোয় জ্বলমানবেহেশতের যুবনেতার নাম - ইমাম হাসান !
Read More ... »

মানবাধিকারের রক্ষক সেজেছে মানবাধিকার লংঘনকারী পশ্চিমারা

বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বের প্রতিটি দেশ মানবাধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া একটি দেশকে কোন কারণে অভিযুক্ত করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে খুব সহজেই যে অভিযোগটি আনা হয় তা হচ্ছে মানবাধিকার লংঘন। বিশ্বের তিন চতুর্থাংশ দেশ মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং বাকি এক চতুর্থাংশ দেশ ঐ কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেও এর ধারাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছে। এখনো মানবাধিকার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞার ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহিত না হলেও সার্বিকভাবে মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে সকল দেশ কমবেশী চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা ও ফ্রান্স নিজেদেরকে মানবাধিকারের রক্ষক বলে দাবি করে এবং বিভিন্নভাবে এ দাবির যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করতেও ভুল করে না।
এসব দেশ তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী এমন একটা ধারণা তৈরি করে দিয়েছে যে, এসব পশ্চিমা দেশ মানবাধিকারের লালনভূমি। পশ্চিমা দেশগুলো এমন সময় নিজেদের মানবাধিকারের ধ্বজাধারী বলে দাবি করছে যখন ঐসব দেশে কিংবা ঐসব দেশের নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা জঘন্যতম পন্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কিন্তু গণমাধ্যম নিজেদের হাতে থাকায় তারা এসব মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা অতি সাধারণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে এবং অন্য কোন দেশের অতি সাধারণ ঘটনাকে মানবাধিকার লংঘন বলে হৈ চৈ ফেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বের স্বাধীনচেতা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য মানবাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পাশাপাশি এসব পশ্চিমা দেশের অনেক সংগঠনও তাদের দেশগুলোতে মানবাধিকার লংঘনের অসংখ্য চিত্র তুলে ধরেছে। এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে মানবাধিকারের ধ্বজাধারী দেশগুলোতে মানবাধিকার লংঘনের চিত্র তুলে ধরবো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু ঐ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টিপাত করা হয় না। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে খুন, ধর্ষণসহ এ ধরনের অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের চোখে এসব ঘটনা যেন কোন অপরাধই নয়। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক দম্পতি কর্তৃক ১১ বছরের এক বালিকাকে অপহরণ এবং তাকে ১৮ বছর যাবৎ যৌন-দাসী হিসেবে ব্যবহার করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে নিজ বাড়ির সামনে থেকে অপহৃত হয়েছিলো জায়সী লি ডুগার্ড। জায়সীর বয়স বর্তমানে ২৯ বছর এবং গত ১৮ বছর ধরে তাকে সান ফ্রান্সসিস্কো থেকে ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত গ্যারিডোর বাড়ির পেছনে একটি তাবুতে আটক রাখা হয়েছিলো। ঐ তাবুতে জয়সীর ওপর উপর্যপুরি শারিরীক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং অপহরণকারী উগ্রবাদী খ্রীস্টান গ্যারিডোর মাধ্যমে জায়সী ১৫ ও ১১ বছরের দুই কন্যা সন্তানের মা হয়েছে। গ্যারিডো স্বীকার করেছে যে, সে ১৯৯১ সালে জায়সীকে অপহরণ করেছিলো। ধর্ষণের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েই গ্যারিডো ক্ষান্ত হয় নি, ঐ দুটি অবুঝ সন্তানকে সে কোনদিনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় নি এবং লেখাপড়ার সুযোগ থেকেও তাদের বঞ্চিত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই লোমহর্ষক ঘটনাটি এমনভাবে বর্ণনা করেছে, যেন কিছুই ঘটে নি। জীবনের গোপন রহস্যগুলো বুঝে ওঠার আগেই ১১ বছরের একটি মেয়ের ওপর এতবড় পাশবিক অত্যাচার চাপিয়ে দেয়া হলেও সেখানে মানবাধিকার লংঘনের লেশমাত্র খুঁজে পায়নি পশ্চিমা গণমাধ্যম বা সরকারগুলো। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার এক ইহুদীবাদী তার নিজের মেয়েকে বছরের পর বছর নিজ বাড়ির গোপন কক্ষে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে বলে খবর বেরিয়েছিলো। নিজের মেয়ের গর্ভে তার অনেকগুলো সন্তানও রয়েছে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সে তার অপরাধগুলো অকপটে স্বীকার করেছে। ঐ ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমে শীর্ষ খবর হিসেবে ছাপা হয়েছে। কিন্তু ঐ খবরের প্রকাশভঙ্গিও এমন ছিলো যে আর দশটা অপরাধের মতো এটিও একটি অতি সাধারণ অপরাধ এবং তেমন কোন মানবাধিকারই লঙ্ঘিত হয় নি। এছাড়া ইরাক, আফগানিস্তান ও গুয়ান্টানামো বন্দী শিবিরসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সেনাদের লোমহর্ষক ও পাশবিক নির্যাতনের স্মৃতি বিশ্ববাসী কখনোই ভুলতে পারবে না। ঐসব নির্যাতন যে এখন বন্ধ হয়ে গেছে তা নয়, বরং এ ধরনের নির্যাতনের খবর যাতে আর প্রকাশ হতে না পারে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা নিয়েছে।
মানবাধিকার লংঘনের দিক দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বৃটেনও কোন অংশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে নেই। বৃটেনের পারিবারিক সহিংসতার ওপর গবেষণাকারী একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, দেশটির অসংখ্য নারী তাদের স্বামীদের হাতে নির্যাতিত হলেও সে খবর কেউ রাখছে না। অনেক অভিবাসী নারী তাদের ওপর নির্যাতনের খবর ঘুনাক্ষরেও প্রকাশ করে না, কারণ তাতে করে তাদেরকে বৃটেন থেকে বহিস্কার করা হতে পারে। বৃটেনে যে শুধু অভিবাসী ও অবৃটিশ নারীরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয় তা নয়। এক জরীপে দেখা গেছে, প্রতি ৪ বৃটিশ নারীর একজন তার পুরুষ সঙ্গীর দ্বারা শারিরীক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বৃটেনে প্রতি সপ্তাহে ২ জন নারী খুন হচ্ছে এবং শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে খুনের সময় হতভাগ্য নারীর শিশুসন্তান খুনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে। ইংল্যান্ডের লাইচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক জরীপে দেখা গেছে, প্রতি ৫ বৃটিশ নারীর একজন জীবনের কোন না কোন সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
এদিকে বৃটেনে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় পাঁচ'শ অভিবাসী শিশুকে বন্দি শিবিরে আটক রাখা হয়েছে বলে দেশটির ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট বিভাগ জানিয়েছে। এসব শিশু দারিদ্র্যপীড়িত ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত জিম্বাবুয়ে, সুদান, শ্রীলংকা ও কঙ্গোর মতো দেশগুলো থেকে তার অভিভাবকদের সাথে বৃটেনে প্রবেশ করেছিলো। বছরের প্রথম তিন মাসে ২২৫ টি শিশুকে মুক্তি দেয়া হলেও এর মধ্যে মাত্র এক'শ শিশু বৃটেন থেকে চলে গেছে। অধিকাংশ শিশুকেই চার সপ্তারও বেশি সময় ধরে আটক রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখার কারণে কোমলমতি শিশুরা নানা মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে গার্ডিয়ান পত্রিকা খবর দিয়েছে।
মানবাধিকারের ধ্বজাধারী আরেক দেশের নাম কানাডা। দেশটি রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার নামে এবং অন্যান্য অজুহাতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার অভিবাসী গ্রহণ করে। লোভনীয় প্রচার চালিয়ে কানাডাকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের কাছে ভূপৃষ্ঠের স্বর্গ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু কানাডায় যাওয়ার পর তারা চরম বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয় অত্যন্ত অমানবিকভাবে তাদের অধিকার লংঘিত হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছর 'কানাডায় মানবাধিকার লংঘন' শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করেছে। বইটিতে কানাডায় মানবাধিকার লংঘনের যেসব অভিযোগ তুলে ধরেছে সেসবের মধ্যে রয়েছে আশ্রয় গ্রহণকারী ও অভিবাসী জনগোষ্ঠির অধিকার লংঘন, অভিবাসীদের ওপর পুলিশী হয়রনি ও নির্যাতন, নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, স্থানীয় অধিবাসীদেরকে সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা ইত্যাদি।
ফ্রান্সে মানবাধিকার লংঘনের কথা বললে অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবেন না। কারণ, দেশটিকে মানবাধিকার রক্ষার আদর্শ বলে মনে করা হয় এবং মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে প্রথম ঘোষণাটি ঐ দেশে প্রকাশিত হয়েছিলো। তবে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় বাক স্বাধীনতার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হলেও ফরাসী আইনে হোলোকাস্টের সমালোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশিষ্ট ফরাসী ইতিহাসবিদ ও গবেষক রজার গারুদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে হোলোকাস্টের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সত্য ঘটনাটি তুলে ধরার অপরাধে তাকে জেল খাটতে হয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার লংঘিত হচ্ছে পদে পদে। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ অর্থাৎ ৬০ লাখ অধিবাসী মুসলমান। অথচ সেকুলারী শাসনব্যবস্থার অজুহাত তুলে মুসলিম মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পরতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার মুসলিম মেয়ে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর ফ্রান্সের মুসলমানরা ফরাসী নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন।
Read More ... »

ইমাম আলী (আঃ)

ভেতরের অলংকার সুন্দরতরো বাইরের চেয়ে জ্ঞানের সৌন্দর্য সে তো কখনোই থাকে না লুকিয়েপুরুষের সৌন্দর্য হলো তার ব্যক্তিত্ব আর ভদ্রতায় মানুষের সৌন্দর্যের রহস্য সততা আর সত্যবাদিতায়
পাঠক! উপরোক্ত ক'টি লাইন ইমাম আলী (আঃ) এর কবিতা। তাঁরি শুভ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আপনাদের সবার প্রতি রইলো আন্তরিক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ। পৃথিবীতে যতো মহান মনীষীর জন্ম হয়েছে তাঁদের অন্যতম একজন হলেন ইমাম আলী (আঃ)। তাঁর এই মহত্ব, বিশালত্ব এবং ধী-শক্তি প্রমাণ করে যে ইসলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যথার্থ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে সক্ষম। কবিতায় সৌন্দর্যের কথা বলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এই সৌন্দর্য ছিল তাঁর মধ্যে অফুরন্ত। ছিল চারিত্রিক সৌন্দর্য, ছিল আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা এবং সর্বোপরি আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য। তাঁরজ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য সমাজে সবসময় আলো বিকিরণ করেছে এবং এখনো বিশ্বব্যাপী করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও যে তা অব্যাহত থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই পৃথিবীতে বহু শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। সমাজে তাদের প্রভাবও পড়েছে। কিন্তু সেইসব শক্তি ইতিবাচক কোনো আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয় নি। আবার এমন অনেক ব্যক্তিত্বেরও জন্ম হয়েছে,যাঁদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। কারণ তাঁরা মানবতার স্বার্থে নিজেদের জ্ঞান ও গুণকে কাজে লাগিয়ে সমাজে যে আলো বিলিয়ে গেছেন সেই আলো আজো অম্লান রয়েছে। মানুষ সেই আলো থেকে আজো অজ্ঞতার আঁধার দূর করছে। তেমনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো বিকিরণকারী অসামান্য একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন হযরত আলী (আঃ)।
তিনিই সত্য , স্বয়ং সত্য যাঁর নিত্য সহগামী পৃথিবীর পবিত্রতম গৃহে জন্ম নিয়ে যিনি অনন্যযাঁর জ্ঞানের দরোজা পেরিয়ে যেতে হয় নগরেরাসূলের জ্ঞান-ধ্যানের পবিত্র আলোয় ধন্য যে নগর জাহেলি পৃথিবীকে দিয়েছে আলোর দিশাশ্বাশ্বত যে আলোয় কেটে গেছে কালের অমানিশা।
খাওয়ারেযমি লিখেছেন, নবী করিম ( সা ) বলেছেন, আমার পরে আমার উম্মতের মধ্যে সবচে বড়ো জ্ঞানী হলেন আলী ইবনে আবি তালিব। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারীও বর্ণনা করেন,একদিন নবীজী উচ্চস্বরে বললেন,আমি হলাম জ্ঞান ও বিজ্ঞানের শহর আর আলী হলেন সেই শহরের দরোজা। তাই যে-ই জ্ঞান অর্জন করতে ইচ্ছুক সে যেন এই শহরের দরোজার কাছে যায়।
হযরত আলী ( আ ) যে জ্ঞানী ছিলেন তাঁর নাহজুল বালাগা-ই তার প্রমাণ। ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের বিচিত্র সমস্যার নৈয়ায়িক সমাধান যারা চায়, সেইসব ন্যায়-নীতিবান মানুষদের জন্যে নাহজুল বালাগাহ একটি চমৎকার গাইড লাইন।
বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী ও দার্শনিক মরহুম আল্লামা মুহাম্মাদ তাকি জাফরি আলী (আঃ) এর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন-দয়া এবং ভালোবাসা মানুষের উন্নত স্বাভাবিক গুণ। সকল মানুষের মাঝেই এইসব গুণাবলি লক্ষ্য করা যায়। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় ছোটোখাটো ভুলের জন্যেও ঐ ভালোবাসা শত্র"তায় পরিণত হয়। কিন্তু যেসব মানুষ উন্নত নৈতিক গুণাবলি অর্জন করেছেন,তাঁদের ক্ষেত্রে এই ভালোবাসা ব্যক্তিগত প্রবণতা বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তাঁরা সত্যের মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন। কেননা তাঁদের দৃষ্টিতে স্বভাবত বা সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ ভালোবাসার পাত্র। এই বৈশিষ্ট্যটা ইমাম আলী ইবনে আবি তালেব (আঃ) এর সমগ্র জীবনব্যাপী লক্ষ্য করা যাবে। সিফফিনের যুদ্ধে শত্র"রা আলী ( আ ) এর সেনাদের জন্যে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলো যাতে আলী (আঃ) এর সেনারা তৃষ্ণায় মারা যায়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আলী (আঃ) এর সেনারা ব্যাপক বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শত্র"পক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করে। ফলে ফোরাতের পানির নিয়ন্ত্রণ আলী (আঃ) এর সেনাদের হাতে এসে যায়। ইমামের সঙ্গীরা তখন শত্র"দের মতোই পানি সরবরাহ তাদের জন্যে বন্ধ করে দিতে চাইলো। কিন্তু আলী (আঃ) একাজ থেকে তাঁর সেনাদের বিরত রাখলেন এবং বললেন,"আমি কখনোই এভাবে বিজয় লাভ করতে চাই না। কেননা এই বিজয়ের মধ্যে মুসলমানিত্বের কোনো চিহ্ন নেই।"
একইভাবে ইমাম আলী (আঃ) এর মাথা মুবারকে ইবনে মুলযেম নামায পড়া অবস্থায় তলোয়ার দিয়ে যখন আঘাত হেনেছিল তখনও ইমাম সবকিছুর আগে তাঁর সন্তান ইমাম হাসান (আঃ) কে বলেছিলেন তাঁর হত্যাকারীর ওপর যেন জুলুম নির্যাতন করা না হয়। এটা হলো সেই চারিত্র্যিক সৌন্দর্য , সেই ভালোবাসা,যা মহান মনীষীগণকে উন্নত এবং পূর্ণতাপ্রাপ্তির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।হযরত আলী (আঃ) ছিলেন সেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত মহান মনীষীদের অন্যতম। প্রশ্ন জাগতেই পারে কী করে তিনি এইসব অসামান্য গুণাবলি অর্জন করেছেন? উত্তরটা খুবই সোজা। কেননা তিনি পরশ পাথরের সংস্পর্শে বেড়ে উঠেছেন,মানুষ হয়েছেন। আল্লাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর ঘরে বড়ো হয়েছেন যেখান থেকে ইসলামের দাওয়াত শুরু হয়েছিল। সারাটি জীবন তিনি নবীজীর সাহচর্যে ছিলেন। তাঁর সাহচর্য পেয়েই আধ্যাত্মিকতার পূর্ণতায় পৌঁছেছেন তিনি।বর্তমান বিশ্বে জোর যার মুল্লুক তার-এরকম অবস্থা বিরাজমান। যিনি শাসক তিনি যেন আইন-কানুনের উর্ধ্বে। তাঁর ব্যাপারে যেন কোনো আইন নেই, বিচার নেই। কে করবে তার বিচার-এরকম একটি অবস্থা। অথচ আলী (আঃ) সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনোদিন খেলাফতের শক্তি বা ক্ষমতাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেন নি। একটি ঘটনার উল্লেখ করে আজকের আলোচনার পরিসমাপ্তি টানবো। হযরত আলী (আঃ) তাঁর খেলাফতকালে একদিন তাঁর বর্মটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। যতোই খোঁজাখুঁজি করলেন পেলেন না। কিছু সময় পেরিয়ে গেল। একদিন একটি গলিতে কুফার এক খ্রিষ্টান লোকের হাতে দেখলেন তার ঐ হারানো বর্মটি। লোকটি নিকটবর্তী হতেই তিনি চিনতে পারলেন তাঁর বর্মটি। আলী (আঃ) লোকটিকে তাঁর বর্মটি ফিরিয়ে দিতে বললেন। কিন্তু খ্রিষ্টান লোকটি অস্বীকার করে বললো-এটা তারি বর্ম। ফয়সালার জন্যে দু'জনেই গেলেন শহরের কাজির কাছে।
কাজী আলী (আঃ) কে খলিফা হিসেবে কোনোরকম গুরুত্ব না দিয়ে একজন সাধারণ বাদীর মতোই দেখলেন। বাদী-বিবাদী উভয়কেই নিজ নিজ স্থানে বসতে বললেন এবং ঘটনা কী জানতে চাইলেন। আলী (আঃ) বললেন ওর হাতের ঐ বর্মটা আমার। আমি না বিক্রি করেছি না তাকে দান করেছি। তাকে ফেরত দিতে বললে সে ফেরত দিলো না। পক্ষান্তরে খ্রিষ্টান লোকটিও বললো যে বর্মটা তার। বিচারক এবার ইসলামী আইন অনুযায়ী আলী (আঃ) কে দুইজন স্বাক্ষী আনতে বললেন। আলী (আঃ) বললেন-মেকদাদ এবং আমার ছেলে হাসান স্বাক্ষী দেবে যে ঐ বর্মটা আমার। কাজী বললেন-মেকদাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য কিন্তু হাসানের নয়,কারণ হাসান আপনার সন্তান। ফলে আপনি ঐ বর্মের মালিকানা দাবি করতে পারেন না, বর্মটা তাই খ্রিষ্টান লোকটির।
আলী (আঃ) বিচারকের রায় শোনার পর কোনোরকম অভিযোগ না করে উঠে চলে গেলেন। খ্রিষ্টান লোকটি জানতো যে আলী (আঃ) তার শাসন-ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে পারতেন,কিন্তু তিনি আদালতের শরণাপন্ন হলেন। এ বিষয়টি খ্রিষ্টান লোকটিকে ভীষণভাবে বিস্মিত করে। সে আলী (আঃ) এর পূত-পবিত্রতা এবং সততা দেখে অবিশ্বাস্যরকমভাবে উঠে দাঁড়ালো এবং আলী (আঃ) এর পেছনে ছুটলো। নিজেকে আলীর পায়ে সঁপে দিলো। আলী (আঃ) তাকে ওঠালেন এবং শান্তহতে বললেন। খ্রিষ্টান লোকটি সলজ্জভাবে আলী (আঃ) কে তাঁর বর্মটি ফেরত দিলো এবং সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করলো।
Read More ... »

বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি নজরুল

শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন খেলাধুলা ও ব্যায়ামের প্রয়োজন, তেমনি মনের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন বিনোদন। আর বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে গান। তবে সে গান যদি হয় আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামী বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে তাহলে তো কথাই নেই। এতে যেমন চিত্ত বিনোদনও হয়, তেমনি ইসলামের প্রতি আগ্রহও সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষায় যেসব গীতিকার ইসলামী গান লিখেছেন, তাদের মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম সবার আগে চলে আসে। ইসলামের এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা পর্ব নেই যা নিয়ে তিনি গান কিংবা কবিতা লিখেননি। তো ইসলামী গান রচনায় নজরুলের অবদান সম্পর্কে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছি।
অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি মসজিদে মুয়াযযিন ছিলেন এবং ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন। যে ইসলামী ভাবধারা নিয়ে তিনি জীবনযাত্রা শুরু করেছিলেন, তিনি তা আজীবন লালন করে গেছেন। আল্লাহ প্রেম ও রাসূলের প্রতি ভালবাসা ঠাঁই পেয়েছিল তার মনের গহীনে। তাইতো তিনি তার কবিতা ও গানের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ-রাসূলের বাণী শুনিয়েছেন এবং কোরআন হাদিসের আলোকে মানবতার গান গেয়েছেন।
আল্লাহর পরিচয় কি, তিনি কাছে না দূরে থাকেন, তাঁকে চেনার উপায় কি এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে নজরুল বলেছেন, আল্লাহ যদিও ধরাছোঁয়ার বাইরে, তবুকে এই মহান সত্তাকে চেনা যাবে তার সৃষ্টিতে, তাঁকে অনুভব করা যাবে প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে। তিনি এক স্থানে বা এক বস্তুতে সীমাবদ্ধ নন, বরং আকাশ-জমিনের সর্বত্র তিনি বিরাজমান। সে জন্যই কবি আল্লাহর নির্দিষ্ট কোন নাম খুঁজে পাননি। আল্লাহর ৯৯টি গুনবাচক নাম থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে 'অ-নামিকা' নামে সম্বোধন করেছেন। কবি লিখেছেন-
কোন নামে হায় ডাকব তোমায়নাম না জানা অ-নামিকাজলে স্থলে গগন তলেতোমার মধুর নাম যে লিখা।।নজরুল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ্যত্বের পাশাপাশি তার সৌন্দর্যও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর সৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন,
হে চির-সুন্দর, বিশ্ব চরাচরতোমার মনোহর রূপের ছায়া,রবি শশী তারকায় তোমারই জ্যোতি ভায়রূপে রূপে তব অরূপ কায়া।
তিনি কেবল আল্লাহর সৌন্দর্যই বর্ণনা করেননি, তাঁর উপর ভরসা রাখাও আহবান জানিয়েছেন। লিখেছেন-
ও মন, কারো ভরসা করিসনে তুইএক আল্লাহর ভরসা কর,আল্লাহ যদি সহায় থাকেনভাবনা কিসেব, কিসের ডর।
নজরুল আল্লাহকে খুঁজেছেন সৃষ্টির সব সৌন্দর্যের মাঝে। সৃষ্টির যেখানেই রূপ দেখেছেন, সেখানেই আল্লাহকে স্মরণ করে তাঁরই বন্দনা করেছেন। এক গানে কবি ফুলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, হে ফুল ! বলো তো তুমি এ সুগন্ধ কোথায় পেলে ? এই অতুলনীয় রূপ তোমায় কে দিল, যার কারণে তুমি দুনিয়ায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছো। ফুল উত্তরে বলেছিল, আল্লাহ তায়ালাই আমাকে এই রূপ আর সুগন্ধি দান করেছেন। নজরুলের ভাষাতেই শোনা যাক -
ফুলে পুছিনু, বলো বলো ওরে পুল, কোতা পেলি এ সুরভী, রূপ এ অতুল ? -
আগেই বলেছি যে, নজরুলের কবিতা ও গানে আল্লাহ প্রেমের কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তার কয়েকটি গানের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ আমার প্রভূ আমার নাহি নাহি ভয়, খোদার প্রেমের শারাব পিয়ে বেহুশ হয়ে রই পড়ে, ‘মাগো আমায় শিখাইলী কেন আল্লাহ্‌ নাম, জপিলে আর হুঁশ থাকে না ভুল সকল কাম'; ‘যে পেয়েছে আল্লাহর নাম সোনার কাঠি, তার কাছে ভাই এই দুনিয়া দুধের বাটি'; ‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে, ফলবে ফসল বেচব তারে কিয়ামতের হাটে।' এসব গান ছাড়াও কবি নজরুল তাঁর গানের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে অনেক কিছু চেয়েছেন। এ ধরনের কয়েকটি গান হলো, ‘তওফিক দাও খোদা ইসলামে, মুসলিম জাঁহা পুন হোক আবাদ' ; ‘রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করো না বিচার, বিচার চাহি না তোমার দয়া চাহে এ গুনাহগার'; ‘খোদা এই গরীবের শোন শোন মুনাজাত', "আল্লাহর কাছে কখনো চেয়ো না ক্ষুদ্র জিনিস কিছু, আল্লাহ ছাড়া কারো কাছেও কভু শির করিও না নিচু" ইত্যাদি ।
কবি নজরুল আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেম নিবেদনের পাশাপাশি রাসূলের প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছেন। কখনো তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে নবীজীর রওযা জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, আবার কখনও নবীজী জন্ম, তাঁর জীবন দর্শন, তাঁর শিক্ষা ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, নবীজীকে নিয়ে তিনি নাত লিখেছেন একশ'র উপরে ! মহানবী প্রশংসা ও গৌরবসূচক এসব গানের জন্য মুসলিম সমাজ কবি নজরুলের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। নজরুল কয়েকটি নাতে রাসূলের কলি হচ্ছে, "ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়, আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।""মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলাতুমি বাদশার বাদশাহ, কামলিওয়ালা।"" মোহাম্মদ না জপেছিলি বুলবুলি তুই আগেতাই কি রে তোর কণ্ঠের গান এমন মধুর লাগে।""মোহাম্মদ মোর নয়ন-মনি মোহাম্মদ মোর জপমালাঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসরের পিয়ালা।"
কবি নজরুল যে মানুষটিকে নয়নমনি ভেবেছেন তাঁকে নিয়ে যে সুন্দর সুন্দর গান লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। সে যাই হোক, নজরুলের লেখা আরো কয়েকটি বিখ্যাত নাতে রাসুল এরকম-নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহমদ বোল, তৌহিদেররই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম, তোমার নামে একি নেশা হে প্রিয় হযরত, এ কোন মধুর শারাব দিলে আল-আরাবী সাকি, মোহাম্মদ নাম যতই জপি ততই মধুর লাগে, রসুল নামের ফুল এনেছি রে গাথবি মালা কে ?, ইয়া মোহাম্মদ বেহেশত হতে খোদায় পাওয়ার পথ দেখাও- ইত্যাদি।
কেবল হামদ ও নাত লিখেই নজরুল ক্ষান্ত হননি, তিনি মুসলিম জাতির পরিচয়, তাদের অতীত, মুসলমানদের বিভিন্ন পর্ব ইত্যাদি নিয়ে চমৎকার সব গান লিখেছেন। মুসলমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-
ধর্মের পথে শহীন যাহারা আমরা সেই সে জাতিসাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি।
অন্যদিকে ঈদ, কোরবানী, মহররম, ফাতিহা-ই-দোয়ায-দহম তথা রবিউল আউয়াল নিয়ে প্রচুর ইসলামী গান ও কবিতা লিখেছেন। ঈদ নিয়ে নজরুলের লেখা 'ও মন রমজানের ঐ রোযার শেষে এল খুশীর ঈদ-এ গানটি না শুনলে ঈদের আনন্দই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। অন্যদিকে মহররমের চাঁদ এল ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়া, ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়- এ মর্সিয়াটির মাধ্যমে আমরা কারবালায় শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করি।
মহররমের শোকের পাশাপাশি নবীজীর আবির্ভাবের আনন্দঘন দিনটি অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,আসিয়াছেন হাবিবে খোদা, আরশ পাকে তাই ওঠেছে শোর;চাঁদ পিয়াসে ছুটে আসে আকাশ পানে যেমন চকোর।অথবাইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগরবদনসীন আয়, আয় গুনাহগার নতুন করে সওদা কর। অথবাত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।
১২ রবিউল আউয়াল, মহরররম ছাড়াও কবি নজরুল নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি বিষয়েও গান ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখা থেকে বাদ পড়েননি ইসলামের বিশিষ্ট সাহাবী ও ইসলামী আন্দোলনের যোদ্ধারাও। নজরুলের কাব্য ও গানে ইসলামের বিভিন্ন দিক চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে বলেই তিনি আজও মুসলিম সমাজে এত জনপ্রিয়। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে নজরুলই একমাত্র সফল লেখক যিনি তার কলমের মাধ্যমে মুসলিম জাহানের সোনালী অতীত ফিরে পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘তওফিক দাও খোদা ইসলামে, মুসলিম জাঁহা পুন হোক আবাদ' ।
কবি নজরুলের ইসলামী গানের বিশাল ভান্ডার থেকে কয়েকটি গান নিয়ে আলোচনা করা হলো। আপনারা সুযোগ পেলে তাঁর লেখা ইসলামী গানগুলো শোনার চেষ্টা করবেন -কেমন !
Read More ... »

হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ) : ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম নারী

দশই রমজান ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম নারী ও সর্বশেষ্ঠ নবীর প্রিয়তম সহধর্মিনী হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ)-র মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে আমরা হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ)-র জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করব।
মক্কাবাসীর কাছে 'তাহিরা' বা 'পবিত্র' নামে খ্যাত খাদিজা (সাঃ আঃ)-র ইন্তেকালের পর রাসূল (সাঃ) আরও একা হয়ে পড়েন। কারণ এর কিছু দিন আগে রাসূল তার প্রিয় চাচা আবু তালিবকে হারান। দুই প্রিয় মানুষকে হারিয়ে রাসূল(সাঃ) এত বেশী শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, ঐ বছরকে তিনি 'শোক বর্ষ' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। খাজিদা(সাঃআঃ)-র ইন্তেকালের পর রাসূল (সাঃ) ভীষণ কেদেছেন। তিনি কেঁদে কেঁদে বলেছেন, "খাদিজা তুলনাহীন। সবাই যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে সময় আমি তার সর্বাত্বক সমর্থন পেয়েছি, পেয়েছি সার্বিক সহযোগিতা। ইসলাম প্রচার ও প্রসারে খাদিজা তার অর্থ-সম্পদ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছে।
আরবের কোরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ)। কিন্তু তার পরও খাদিজা (সাঃ আঃ) অত্যন্ত সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। তিনি জন্মের পর থেকেই একত্ববাদী ছিলেন। ইসলাম আবির্ভাবের আগে তিনি ইব্রাহিম (আঃ)-র ধর্মে বিশ্বাস করতেন। তৎকালীন সমাজে সৎকর্ম ও দানশীলতার ক্ষেত্রে হযরত খাদিজার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন হিজাজের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী। বিজ্ঞ ও সুদূর প্রসারী দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী খাদিজা (সাঃ আঃ)-র আধ্যাত্মিকতার প্রতি ব্যপক ঝোঁক ছিল। খাদিজা (সাঃ আঃ) সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর আবির্ভাবের অপেক্ষায় ছিলেন এবং তিনি আরবের সচেতন ও শিক্ষিত প্রবীণদের কাছে শেষ নবীর নিদর্শন সম্পর্কে মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। কিন্তু কি সৌভাগ্য নবুয়্যতপ্রাপ্তির আগেই রাসূলের সাথে পরিচয় ঘটল হযরত খাদিজার। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিজের ব্যবসায়িক কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় পাঠালেন। এরপরই বিবি খাদিজার কাছে রাসূলের সৎ গুণাবলীগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। খাদিজা (সাঃআঃ) বুঝতে পারলেন, সমাজের অতুলনীয় ও পবিত্রতম পুরুষ হচ্ছেন মুহাম্মদ (সাঃ)।
হযরত খাদিজা আরও বুঝতে পারলেন, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মানবিক গুণাবলীতে অনন্য এবং তিনি বঞ্চিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠা চান। রাসূলের এসব গুণাবলী হযরত খাদিজাকে আকৃষ্ট করে। এরপরই তিনি রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমার আমানতদারি, সচ্চরিত্র, সত্যবাদিতা, ভদ্রতা ও মর্যাদা আমাকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এরপরই তিনি রাসূলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান এবং দু'জনের মধ্যে দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।
বিবি খাদিজা জানতেন যে, রাসূলের সাথে বিয়ে হলে তিনি তাকে ঐশী পথে পরিচালিত করবেন। তবে খাদিজা (সাঃ আঃ)-র বিয়েকে তৎকালীন সমাজ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। তৎকালীন অন্ধকার যুগে সামাজিক সম্পর্কের মাপকাঠি ছিল অর্থ-সম্পদ। এ কারণেই খাদিজা (সাঃ আঃ) সম্পদহীন রাসূল (সাঃ)-কে বিয়ে করায় অনেকেই তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। কুরাইশ বংশের এক দল অহংকারী ও নিন্দুক মহিলা খাদিজা (সাঃ আঃ) কটাক্ষ করে বলতো, তোমার এতো আভিজাত্য ও সম্পদের অধিকারী হবার পরও কেন দরিদ্র এক যুবককে বিয়ে করলে?
খাদিজা (সাঃ আঃ) এর জবাবে বলেছিলেন, "এই সমাজে মুহাম্মদ (সাঃ)-র মতো আর কেউ কি আছে? তার মতো সচ্চরিত্রবান ও মর্যাদাবান দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিকে কি তোমরা চেন? আমি তার সৎ গুণাবলীর কারণেতাকে বিয়ে করেছি।" কিন্তু সেই সমাজের গোড়া ও মুর্খ মানুষের কাছে বিবি খাদিজার যুক্তি বোধগম্য ছিলো না। এ কারণে হিজাজের জেদি মহিলারা হযরত খাদিজার সাথে শত্রুর মতো আচরণ করেছে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-র নবুয়্যত প্রাপ্তির পর ঐসব মহিলার বিদ্বেষ আরও বেড়ে যায় এবং এই বিদ্বেষের মাত্রা এত বেশি ছিল যে, খাদিজা (সাঃ আঃ)-কে তারা তার সন্তান প্রসবের সময় বিন্দু পরিমাণ সহযোগিতাও করেনি। সবমিলিয়ে হযরত খাদিজা(সাঃআঃ) ঐ সমাজে একা হয়ে পড়েছিলেন। তৎকালীন সমাজের নারীরা তাকে সহযোগিতা না করলেও আল্লাহ তার সহযোগিতায় পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মহিলাদেরকে পাঠিয়েছিলেন।
বিপুল সম্পদের মালিক এবং সমাজে ব্যাপক প্রভাবশালী হবার পরও রাসূলের সাথে খাদিজা (সাঃ আঃ)-র ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তার আচার-ব্যবহারে অহমিকার লেশ মাত্র ছিল না। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি রাসূলের ব্যাপক আগ্রহের বিষয়ে তিনি ভালো ভাবে অবহিত ছিলেন। একারণে বিবি খাদিজা তার সাথে এমন ভাবে আচরন করতেন যে, রাসূলের ইবাদত-বন্দেগীতে কোন ব্যাঘাত না ঘটে। নবুয়্যত লাভের আগে রাসূল (সাঃ) প্রতিমাসে কয়েক বার করে নূর পাহাড়ের চূড়ায় হেরা গুহায় যেতেন। আর মহিয়সী নারী বিবি খাদিজা হাসি মুখে রাসূলকে বিদায় জানাতেন। হযরত আলী (আঃ)-কে দিয়ে তিনি গুহায় নিয়মিত খাবার পাঠাতেন। কখনো কখনো তিনি নিজেও আলী (আঃ)-র সাথে হেরা গুহায় যেতেন। নবুয়্যত লাভের পর রাসূলের অনেক আত্মীয়-স্বজন তাকে প্রত্যাখ্যান করলেও বিবি খাদিজা, রাসূল (সাঃ)-কে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছেন। হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ) বিনা বাক্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি শুধু মুখে ঈমান আনেননি সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত হন। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার সকল সম্পদ রাসূলকে উপহার দিয়েছিলেন। শোয়াবে আবু তালিব নামক উপত্যকায় মুসলমানরা যখন বিচ্ছিন্ন ও অবরোধের শিকার হয়েছিল, তখন বিবি খাদিজার আর্থিক সহযোগিতা মুসলমানদের টিকে থাকতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে। অর্থনৈতিক সংকট দূর হবার পরও হযরত খাদিজার সহযোগিতা মুসলমানদের পথ চলতে সহযোগিতা করেছে।
খাদিজা (সাঃ আঃ) ছিলেন অত্যন্ত ধৈয্যশীল ও সহিষ্ণু। মানব মুক্তির দূত সর্বশেষ নবী রাসূল (সাঃ)-র প্রতি তার পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। এ কারণে নবুয়্যত প্রাপ্তির আগে ও পরে রাসূলের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে তিনি সর্বদায় সচেষ্ট ছিলেন। কোন কারণে রাসূল (সাঃ)-র মন খারাপ থাকলে তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতেন। রাসূলের সকল কাজে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। বলতে গেলে হযরত খাদিজা ছিলেন, রাসূলের এক যোগ্য উপদেষ্টা। মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে হেশাম লিখেছেন, হযরত খাদিজা রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন। রাসূলের বক্তব্যকে সমর্থন করেন এবং তাকে সর্বাত্বক সহযোগিতা দেন। আল্লাহতায়ালা হযরত খাদিজার মাধ্যমে রাসূলকে প্রশান্তি দিতেন। রাসূলের কানে কখনোই দু:সংবাদ পৌছানো হতো না যতক্ষণ না পর্যন্ত আল্লাহ খাদিজার মাধ্যমে ঐ খবর শ্রবনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতেন।
ইতিহাসে এসেছে মক্কার মুশরিকরা একদিন পাথর নিক্ষেপ করে রাসূলকে আহত করে এবং তারা পেছনে পেছনে হযরত খাদিজার বাড়ী পর্যন্ত আসে। এর পর খাদিজা (সাঃ আঃ)-র ঘরেও পাথর নিক্ষেপ করে। এ সময় খাদিজা (সাঃ আঃ) ঘর থেকে বেরিয়ে মুশরিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, "লজ্জা করেনা তোমরা তোমাদের বংশের সবচেয়ে মহানুভব মহিলার ঘরে পাথর নিক্ষেপ করছো? এ কথা শুনে মুশরিকরা লজ্জিত হয়ে চলে যায়। এরপর বিবি খাদিজা রাসূলের জখমের চিকিৎসা করেন। এ সময় রাসূল (সাঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত খাদিজার প্রতি সালাম পৌছান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করার সুসংবাদ দেন। হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ)-কে বেহেশতের মধ্যে কারুকার্যখচিত একটি বিরাট অট্রালিকা দেয়া হবে বলে আল্লাহতায়ালা জানিয়ে দেন, যেখানে কোন দুঃখ-কষ্টের অস্তিত্ব থাকবে না ।
আসলে মুসলমানদের উপর অবরোধ আরোপিত হবার পর হযরত খাদিজা (সাঃ আঃ) অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। এ সময় সম্পদ ও আভিজাত্যের মধ্যে বেড়ে উঠা বিবি খাদিজা দীর্ঘ দিন ধরে শুষ্ক এক উপত্যকায় কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন। ইসলামের জন্য তার অঢেল সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ উপত্যকায় কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করার কারণে হযরত খাদিজার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। তিনি মারাত্বক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলেই তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়।
হযরত খাদিজা (সাঃআঃ) মৃত্যুশয্যায় সর্বশেষ যে কথাটি রাসূল (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন তা হলো, "হে রাসূল আমি আপনার সব অধিকার পরিপূর্ণ ভাবে রক্ষা করতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করে দিন।" আল্লাহর রাসূল ও ইসলামের জন্য এত ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও যেন তার মনে ভরেনি। তিনি ইসলাম ও রাসূলের জন্য আরও কষ্ট করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু মানুষের আয়ু তো নির্দিষ্ট। কাজেই রাসূলকে ছেড়ে তার চলে যেতেই হয়েছে। ইসলামের এই মহীয়সী নারী ৬১৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ই রমজান ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
Read More ... »